মো. জয়নাল আব্দীন
ব্যবসা পরামর্শক | উদ্যোক্তা | আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (টিঅ্যান্ডআইবি)
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিবিসিসিআই)
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা ও শিল্পবাজার। বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত সম্প্রসারিত নগরকেন্দ্র, বিকাশমান বেসরকারি খাত, ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসার এবং আমদানিকৃত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্য, খাদ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা পণ্য, প্রযুক্তি ও জীবনধারাভিত্তিক ব্র্যান্ডের উল্লেখযোগ্য চাহিদা সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বিদেশি উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করছে।
তবে বাংলাদেশে একটি বিদেশি পণ্য সফলভাবে বাজারজাত করা শুধু একজন আমদানিকারক খুঁজে বের করা এবং পণ্য পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশি কোম্পানিকে বাজারের চাহিদা, আমদানি বিধিমালা, শুল্ক ও কর, পণ্যের মান, মূল্য নির্ধারণ, স্থানীয় প্রতিযোগিতা, ভোক্তার আচরণ, বিতরণব্যবস্থা এবং প্রচার-পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের প্রয়োজন সঠিক স্থানীয় ব্যবসায়িক অংশীদার। ইউরোপ, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা উত্তর আমেরিকায় সফল কোনো পণ্য বাংলাদেশে একইভাবে সফল নাও হতে পারে। বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের আগে পণ্য, মূল্য, প্যাকেজিং, বিপণন কৌশল এবং বিতরণব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য স্থানীয় অভিযোজনের প্রয়োজন হতে পারে।
এই নির্দেশিকায় বাংলাদেশে একটি বিদেশি পণ্য সফলভাবে কীভাবে বাজারজাত করা যায়, সে বিষয়ে প্রাথমিক বাজার গবেষণা থেকে শুরু করে আমদানিকারক নিয়োগ, বিধিবিধান অনুসরণ, বিতরণব্যবস্থা, প্রচারণা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার সম্প্রসারণ পর্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
আপনার পণ্যের জন্য বাংলাদেশকে কেন বিবেচনা করবেন?
বাংলাদেশ ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী এবং ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা বা B2B সরবরাহকারী উভয়ের জন্যই সম্ভাবনাময় একটি বাজার। দেশটির অর্থনীতি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, নির্মাণ, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, খুচরা বিক্রয়, আতিথেয়তা এবং ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পখাতে উল্লেখযোগ্য চাহিদা সৃষ্টি করছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো নিম্নোক্ত পণ্যখাতে বাংলাদেশের বাজারে সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে:
- খাদ্য ও পানীয়
- প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্য
- যন্ত্রপাতি ও শিল্প সরঞ্জাম
- রাসায়নিক ও শিল্পের কাঁচামাল
- বস্ত্রশিল্পের যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক উপকরণ
- কৃষি যন্ত্রপাতি ও কৃষি উপকরণ
- অটোমোবাইল পণ্য ও যন্ত্রাংশ
- বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য
- চিকিৎসা সরঞ্জাম ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্য
- গৃহস্থালি পণ্য
- প্যাকেজিং উপকরণ ও যন্ত্রপাতি
- ফ্যাশন ও জীবনধারাভিত্তিক পণ্য
- নির্মাণসামগ্রী
- সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত সমাধান
- শিল্পকারখানার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ
- ভোক্তা ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি
তবে শুধু বাজারের সম্ভাবনা থাকলেই বিক্রয় নিশ্চিত হয় না। সফলতার জন্য একটি সুপরিকল্পিত বাজার প্রবেশ কৌশল অপরিহার্য।
ধাপ ১: বাংলাদেশের বাজার নিয়ে গবেষণা করুন
প্রথম ধাপে নির্ধারণ করতে হবে আপনার পণ্যের জন্য বাংলাদেশে পর্যাপ্ত চাহিদা রয়েছে কি না। শুধু বাংলাদেশের কোনো কোম্পানি আপনার কাছে ব্যবসায়িক অনুসন্ধান পাঠিয়েছে বলেই তাকে আমদানিকারক বা পরিবেশক নিয়োগ করা উচিত নয়। বাজারে প্রবেশের আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করুন:
বাজারের আকার: বর্তমান ভোগ, আমদানির পরিমাণ, স্থানীয় উৎপাদন, প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং সম্ভাব্য ক্রেতা শ্রেণি সম্পর্কে ধারণা নিন।
প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কোন স্থানীয় উৎপাদনকারী এবং বিদেশি ব্র্যান্ড একই বা সমজাতীয় পণ্য বিক্রি করছে তা চিহ্নিত করুন।
প্রতিযোগীদের মূল্য: সম্ভব হলে প্রতিযোগী পণ্যের খুচরা, পাইকারি, পরিবেশক পর্যায় এবং আমদানি পর্যায়ের মূল্য তুলনা করুন।
ক্রেতার ধরন: আপনার পণ্য প্রকৃতপক্ষে কারা কিনবে তা নির্ধারণ করুন—সাধারণ ভোক্তা, কারখানা, হাসপাতাল, খুচরা বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ, কর্পোরেট ক্রেতা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, পাইকারি বিক্রেতা নাকি অন্য কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
বিতরণ কাঠামো: প্রতিযোগী পণ্য কীভাবে আমদানিকারক থেকে পরিবেশক, ডিলার, খুচরা বিক্রেতা এবং চূড়ান্ত ক্রেতার কাছে পৌঁছায় তা বোঝার চেষ্টা করুন।
ভৌগোলিক চাহিদা: ঢাকা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। তবে পণ্যের ধরন অনুযায়ী চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য সুযোগ থাকতে পারে।
একটি পেশাদার বাজার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বিদেশি কোম্পানিকে এমন বাজারে অপ্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগ থেকে রক্ষা করতে পারে, যেখানে তার মূল্য, পণ্যের বৈশিষ্ট্য, প্যাকেজিং অথবা ব্যবসায়িক মডেল প্রতিযোগিতামূলক নয়।
ধাপ ২: সঠিক এইচএস কোড নির্ধারণ করুন
বাংলাদেশি আমদানিকারকের কাছে মূল্য প্রস্তাব দেওয়ার আগে পণ্যের সঠিক হারমোনাইজড সিস্টেম বা এইচএস কোড নির্ধারণ করা জরুরি। এইচএস কোডের ওপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভর করতে পারে, যেমন:
- আমদানি শুল্ক
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক
- মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং অন্যান্য আমদানি পর্যায়ের কর
- প্রয়োজনীয় নথিপত্র
- আমদানি বিধিনিষেধ
- নিয়ন্ত্রক অনুমোদন
- শুল্কায়ন ও পণ্য খালাস
বিদেশি সরবরাহকারীর শুধু এফওবি বা সিআইএফ মূল্য বিবেচনা করে বাংলাদেশের বাজারে পণ্যের সম্ভাব্যতা নির্ধারণ করা উচিত নয়।
বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত:
পণ্যটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর শুল্ক, কর, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, স্থানীয় পরিবহন, আমদানিকারকের মুনাফা, পরিবেশকের মুনাফা, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফা, বিপণন ব্যয় এবং ভ্যাট যোগ করার পর চূড়ান্ত মূল্য কত হবে?
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, করযোগ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট এবং আমদানির প্রকৃতি অনুযায়ী আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও সম্পূরক শুল্কসহ অতিরিক্ত শুল্ক-কর প্রযোজ্য হতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশে বাজারজাতকরণ কৌশল চূড়ান্ত করার আগেই পণ্যের আনুমানিক ল্যান্ডেড কস্ট বা দেশে পৌঁছানোর পর মোট ব্যয় হিসাব করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধাপ ৩: পণ্যটির বিশেষ অনুমোদন প্রয়োজন কি না যাচাই করুন
পণ্যের ধরন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক শর্তাবলি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। বিদেশি সরবরাহকারীদের পণ্য পাঠানোর আগেই যাচাই করা উচিত, বাংলাদেশে তাদের পণ্যের জন্য কোনো ধরনের সনদ, পরীক্ষা, নিবন্ধন, অনুমতিপত্র, লাইসেন্স অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র প্রয়োজন কি না।
এক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিএসটিআই প্রকাশিত বাধ্যতামূলক পণ্যের তালিকায় ৩২৮টি পণ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রযোজ্য বাধ্যতামূলক মানের আওতাভুক্ত পণ্য উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ অথবা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মান অনুসরণ করতে হয়। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী পণ্য পরীক্ষা ও ছাড়পত্রের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রযোজ্য আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে এলসি, ইনভয়েস, বিল অব এন্ট্রি, বিল অব লেডিং, আমদানি নিবন্ধন সনদ, ট্রেড লাইসেন্স এবং টিআইএন সনদসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হতে পারে। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপত্তি সনদ ও স্বাস্থ্য সনদের মতো অতিরিক্ত নথিও প্রয়োজন হতে পারে। পণ্যের ধরন অনুযায়ী অন্যান্য খাতভিত্তিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনেরও প্রয়োজন হতে পারে।
সুতরাং বাণিজ্যিক চালান পাঠানোর আগেই নিয়ন্ত্রক শর্তাবলি যাচাই করা উচিত পণ্য বাংলাদেশের বন্দরে পৌঁছানোর পরে নয়।
ধাপ ৪: বাংলাদেশে যোগ্য আমদানিকারক খুঁজে বের করুন
অনেক বিদেশি কোম্পানির জন্য এটিই বাজারে প্রবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। শুধু কোনো সম্ভাব্য আমদানিকারক নিজেকে “ভালো যোগাযোগসম্পন্ন” দাবি করেছে অথবা একচেটিয়া পরিবেশক হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বলেই তাকে নির্বাচন করা উচিত নয়।
একজন পেশাদার আমদানিকারকের আদর্শভাবে নিম্নোক্ত সক্ষমতা থাকা উচিত:
- আইনগতভাবে নিবন্ধিত ব্যবসায়িক অস্তিত্ব
- বৈধ ট্রেড লাইসেন্স
- আমদানি করার সক্ষমতা
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যথাযথ আমদানি নিবন্ধন সনদ
- টিআইএন এবং প্রাসঙ্গিক কর ও ভ্যাট নথিপত্র
- ব্যাংকিং সক্ষমতা
- সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা
- বিতরণ অবকাঠামো
- বিক্রয়কর্মী
- প্রয়োজন অনুযায়ী গুদাম সুবিধা
- বিদ্যমান ডিলার অথবা খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক
- বিপণন সক্ষমতা
- আর্থিক সামর্থ্য
- ভালো ব্যবসায়িক সুনাম
বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর বা সিসিআইই Importers, Exporters and Indentors (Registration) Orders, 2023-এর আওতায় বাণিজ্যিক ও শিল্প আমদানি নিবন্ধন সনদ প্রদান এবং নবায়নের দায়িত্ব পালন করে।
কোনো বিদেশি সরবরাহকারীর উচিত উল্লেখযোগ্য ঋণসুবিধা, অঞ্চলভিত্তিক একচেটিয়া অধিকার অথবা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশক অধিকার দেওয়ার আগে সম্ভাব্য আমদানিকারকের পরিচয় ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা যাচাই করা।
ধাপ ৫: বাণিজ্যিক ডিউ ডিলিজেন্স পরিচালনা করুন
একজন আমদানিকারকের সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলেও সে আপনার পণ্যের জন্য সঠিক ব্যবসায়িক অংশীদার নাও হতে পারে। সুতরাং বাণিজ্যিক ডিউ ডিলিজেন্স শুধু নিবন্ধন সনদ যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসন্ধান করুন:
ব্যবসায়িক ইতিহাস: কোম্পানিটি কত বছর ধরে ব্যবসা করছে?
পণ্যসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা: কোম্পানিটি কি ইতোমধ্যে একই ধরনের অথবা পরিপূরক পণ্য বিক্রি করছে?
বাজারে সুনাম: সরবরাহকারী, ক্রেতা, ডিলার এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক অংশীদার কোম্পানিটি সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করেন?
আর্থিক সক্ষমতা: প্রতিষ্ঠানটি কি নিয়মিত আমদানির অর্থায়ন করতে সক্ষম?
বিতরণ নেটওয়ার্ক: প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতপক্ষে কতজন ডিলার, খুচরা বিক্রেতা, প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা অথবা বিক্রয় প্রতিনিধি রয়েছে?
গুদাম সক্ষমতা: প্রতিষ্ঠানটি কি পর্যাপ্ত পণ্যের মজুত সংরক্ষণ করতে সক্ষম?
বিপণন সক্ষমতা: প্রতিষ্ঠানটি কি নিজে প্রচারণায় বিনিয়োগ করে, নাকি সম্পূর্ণভাবে বিদেশি উৎপাদনকারীর ওপর নির্ভর করে?
ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা: ব্র্যান্ডটি পরিচালনার জন্য কি তাদের একটি পেশাদার দল রয়েছে?
বিশেষ করে একচেটিয়া পরিবেশক নিয়োগের আগে ডিউ ডিলিজেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্বল কার্যসম্পাদনকারী কোনো একচেটিয়া পরিবেশক কার্যত একটি বিদেশি কোম্পানিকে বাংলাদেশের বাজারে আটকে দিতে পারে।
ধাপ ৬: সঠিক বাজার প্রবেশ মডেল নির্বাচন করুন
সব পণ্যের জন্য একই বাজার প্রবেশ মডেল কার্যকর নয়। বিদেশি কোম্পানিগুলো নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো বিবেচনা করতে পারে:
সরাসরি আমদানিকারক মডেল: এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠিত আমদানিকারকের কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রি করা।
একচেটিয়া পরিবেশক মডেল: সাধারণত নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের শর্তে একটি কোম্পানিকে একচেটিয়া বিতরণ অধিকার দেওয়া।
একাধিক পরিবেশক মডেল: অঞ্চল, শিল্পখাত অথবা ক্রেতার ধরন অনুযায়ী একাধিক পরিবেশক নিয়োগ করা।
ডিলার নেটওয়ার্ক মডেল: একজন প্রধান আমদানিকারক বা পরিবেশকের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে ডিলার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
স্থানীয় প্রতিনিধি মডেল: সম্ভাব্য ক্রেতা সংগ্রহ, সভা সমন্বয়, আমদানিকারককে সহায়তা এবং বাজার উন্নয়নের জন্য স্থানীয় প্রতিনিধি নিয়োগ করা।
স্থানীয় কোম্পানি প্রতিষ্ঠা: সম্ভাব্য ব্যবসার পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে যৌক্তিক করলে বাংলাদেশে নিজস্ব ব্যবসায়িক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করা।
প্রথমবার বাংলাদেশে প্রবেশকারী কোম্পানির জন্য স্থানীয় বাজার উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত আমদানিকারক বা পরিবেশক ব্যবস্থা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ধাপ ৭: সঠিক মূল্য নির্ধারণ কৌশল তৈরি করুন
বিদেশি পণ্য ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো ভুল মূল্য নির্ধারণ। একজন বিদেশি সরবরাহকারী আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক কারখানা মূল্য দিতে পারেন, কিন্তু আমদানি শুল্ক, কর, পরিবহন, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফা যোগ হওয়ার পর পণ্যটি বাংলাদেশের বাজারে ব্যয়বহুল হয়ে যেতে পারে।
সম্পূর্ণ মূল্য শৃঙ্খল হিসাব করুন:
রপ্তানি মূল্য → পরিবহন ও বিমা → শুল্কায়ন মূল্য → শুল্ক ও কর → খালাস ব্যয় → স্থানীয় পরিবহন → আমদানিকারকের মুনাফা → পরিবেশক/ডিলারের মুনাফা → খুচরা বিক্রেতার মুনাফা → বিপণন ব্যয় → চূড়ান্ত ভোক্তা মূল্য
এরপর চূড়ান্ত মূল্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে তুলনা করুন। যদি আপনার পণ্যের মূল্য বাজারে প্রতিষ্ঠিত বিকল্প পণ্যের তুলনায় ৩০–৫০ শতাংশ বেশি হয়ে যায়, তাহলে সেই অতিরিক্ত মূল্যকে যৌক্তিক করার মতো শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে।
এগুলো হতে পারে উন্নত মান, দীর্ঘস্থায়িত্ব, উন্নত প্রযুক্তি, ভালো ওয়ারেন্টি, উচ্চ দক্ষতা, উন্নত উপাদান, প্রিমিয়াম অবস্থান, কারিগরি সহায়তা অথবা কম পরিচালন ব্যয়।
ধাপ ৮: বাংলাদেশের জন্য পণ্যকে স্থানীয়ভাবে উপযোগী করুন
একই পণ্যের একই উপস্থাপনা সব দেশে কার্যকর হবে এমন ধারণা করা উচিত নয়। স্থানীয়করণের মধ্যে থাকতে পারে:
- প্যাকেটের আকার
- লেবেলিং
- ভাষা
- ব্যবহার নির্দেশিকা
- পণ্যের কারিগরি বৈশিষ্ট্য
- ভোল্টেজ বা প্রযুক্তিগত বিন্যাস
- বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগিতা
- স্বাদ
- রং
- নকশা
- ওয়ারেন্টির শর্ত
- বিক্রয়োত্তর সেবা
- মূল্যস্তর
গণভোক্তাভিত্তিক পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাভাষায় যোগাযোগ পণ্যটির গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। প্যাকেটের আকারও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যদি বড় আকারের আমদানিকৃত পণ্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোক্তার জন্য ব্যয়বহুল হয়ে যায়, তাহলে ছোট প্যাকেট তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
যন্ত্রপাতি অথবা কারিগরি পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক ক্রেতাদের মধ্যে ইংরেজি নির্দেশিকা ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য হলেও সহজবোধ্য স্থানীয় নির্দেশিকা, স্থাপন সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং বিক্রয়োত্তর সেবা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
ধাপ ৯: আপনার ব্র্যান্ড ও ট্রেডমার্ক সুরক্ষিত করুন
বিদেশি কোম্পানির উচিত ব্যাপকভাবে পণ্যের প্রচারণা শুরু করার আগেই ট্রেডমার্ক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা। ব্র্যান্ড জনপ্রিয় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। ব্র্যান্ডের মালিকানা, পরিবেশকের অধিকার, বিপণন উপকরণ ব্যবহারের নিয়ম, ডিজিটাল সম্পদ, ডোমেইন নাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট এবং চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া বাণিজ্যিক চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। যেখানে সম্ভব, গুরুত্বপূর্ণ মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিষয় বাংলাদেশের যোগ্য আইনজীবীর মাধ্যমে পরিচালনা করা উচিত।
ধাপ ১০: নিয়ন্ত্রিত বাজার পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু করুন
শুরুতেই অত্যন্ত বড় চালান পাঠানোর পরিবর্তে পরীক্ষামূলক বাজারজাতকরণ বিবেচনা করুন।
নিয়ন্ত্রিত বাজার পরীক্ষা উৎপাদনকারীকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মূল্যায়ন করার সুযোগ দেয়:
- ক্রেতার প্রতিক্রিয়া
- মূল্য গ্রহণযোগ্যতা
- প্যাকেজিং
- পণ্যের বাজার অবস্থান
- পরিবেশকের কার্যসম্পাদন
- ডিলারদের আগ্রহ
- পুনরায় ক্রয়ের প্রবণতা
- অভিযোগ
- প্রতিযোগীদের প্রতিক্রিয়া
ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে নির্বাচিত খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র অথবা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বাজারজাত করা যেতে পারে। B2B পণ্যের ক্ষেত্রে নির্বাচিত সম্ভাব্য ক্রেতাদের নিয়ে পণ্যের প্রদর্শনী, কারিগরি উপস্থাপনা, নমুনা মূল্যায়ন অথবা পরীক্ষামূলক স্থাপন করা যেতে পারে। উদ্দেশ্য হলো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের আগে প্রকৃত বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা।
ধাপ ১১: শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করুন
পণ্য আমদানি করা এবং পণ্য বিতরণ করা দুটি ভিন্ন বিষয়। কোনো কোম্পানি এলসি খুলতে এবং কনটেইনার খালাস করতে সক্ষম হতে পারে, কিন্তু বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক নাও থাকতে পারে। আপনার বিতরণ কৌশলে একটি স্পষ্ট কাঠামো থাকতে পারে: জাতীয় পরিবেশক → আঞ্চলিক পরিবেশক → ডিলার/পাইকার → খুচরা বিক্রেতা → ভোক্তা
পণ্যের ধরন অনুযায়ী এই কাঠামো পরিবর্তিত হবে। শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে সরাসরি কারখানায় বিক্রয়ের প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসাসামগ্রীর ক্ষেত্রে বিশেষায়িত প্রাতিষ্ঠানিক বিতরণব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে পাইকার, সুপারমার্কেট, স্থানীয় খুচরা দোকান, আধুনিক খুচরা বিক্রয়ব্যবস্থা, ই-কমার্স এবং আঞ্চলিক পরিবেশকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হতে পারে। যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে কারিগরি ডিলার, প্রদর্শনী, স্থাপন, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং বিক্রয়োত্তর সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং প্রকৃত ক্রেতার ক্রয় আচরণের ভিত্তিতে বিতরণব্যবস্থা নির্বাচন করুন।
ধাপ ১২: পেশাদার পদ্ধতিতে ডিলার ও পরিবেশক নিয়োগ করুন
পরিকল্পিত ডিলার ও পরিবেশক নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে।
এই কার্যক্রমের মধ্যে থাকতে পারে:
- পরিবেশক হওয়ার সুযোগ সম্পর্কে বিজ্ঞাপন
- সংশ্লিষ্ট শিল্পের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ
- তথ্যভান্ডারভিত্তিক বিপণন
- বাণিজ্য সংগঠনের মাধ্যমে যোগাযোগ
- ব্যবসায়িক ডিরেক্টরি অনুসন্ধান
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা
- টেলিফোনে যোগাযোগ
- আঞ্চলিক সভা
- পরিবেশক সাক্ষাৎকার
- B2B ম্যাচমেকিং
- বাণিজ্যিক ডিউ ডিলিজেন্স
- সরাসরি সভা ও পণ্য উপস্থাপনা
আগ্রহ প্রকাশকারী প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশক নিয়োগ করা উচিত নয়। যোগ্যতার মানদণ্ড তৈরি করুন এবং অঞ্চল বরাদ্দের আগে আবেদনকারীদের মূল্যায়ন করুন।
ধাপ ১৩: বাংলাদেশকেন্দ্রিক বিপণন কৌশল তৈরি করুন
বিদেশি কোম্পানির বৈশ্বিক প্রচারসামগ্রী বাংলাদেশের বাজারের জন্য অভিযোজিত করা উচিত। একটি সমন্বিত বিপণন কৌশলের মধ্যে থাকতে পারে:
ডিজিটাল বিপণন: ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, লিংকডইন, ওয়েবসাইট, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল মাধ্যম।
ট্রেড মার্কেটিং: ডিলার সভা, পরিবেশক সম্মেলন, খুচরা বিক্রেতা প্রচারণা এবং প্রচারসামগ্রী।
B2B বিপণন: ই-মেইল প্রচারণা, টেলিফোন যোগাযোগ, লিংকডইন সংযোগ, কারখানা পরিদর্শন এবং কর্পোরেট উপস্থাপনা।
বাণিজ্য মেলা: প্রাসঙ্গিক প্রদর্শনী বিদেশি কোম্পানিকে ক্রেতা, আমদানিকারক, পরিবেশক এবং প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ দিতে পারে।
জনসংযোগ: পণ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, গণমাধ্যমে প্রচার, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, সাক্ষাৎকার এবং শিল্পভিত্তিক প্রকাশনা ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
উদ্দেশ্য শুধু পরিচিতি তৈরি করা নয়। বিপণন কার্যক্রম থেকে যোগ্য ব্যবসায়িক অনুসন্ধান, পরিবেশক সম্পর্ক, পরীক্ষামূলক ব্যবহার এবং বিক্রয় তৈরি হওয়া উচিত।
ধাপ ১৪: B2B ম্যাচমেকিং আয়োজন করুন
অনেক বিদেশি কোম্পানি, বিশেষ করে B2B উৎপাদনকারীদের ক্ষেত্রে সাধারণ বিজ্ঞাপনের তুলনায় সরাসরি ব্যবসায়িক ম্যাচমেকিং বেশি কার্যকর হতে পারে। পেশাদারভাবে আয়োজিত ম্যাচমেকিং কার্যক্রম বিদেশি কোম্পানিকে নিম্নোক্ত পক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে:
- আমদানিকারক
- পরিবেশক
- ডিলার
- পাইকার
- কর্পোরেট ক্রেতা
- উৎপাদনকারী
- সরকারি ক্রয়সংশ্লিষ্ট অংশীজন
- খুচরা বিক্রয় চেইন
- প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা
সভাগুলো এলোমেলোভাবে আয়োজন না করে আগে থেকেই সম্ভাব্য অংশীদারদের যাচাই করা উচিত। প্রতিটি সভার আগে উভয় পক্ষেরই অপর পক্ষের ব্যবসায়িক পরিচিতি, পণ্যে আগ্রহ, ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা থাকা ভালো।
ধাপ ১৫: বিক্রয়োত্তর সেবায় বিনিয়োগ করুন
নিম্নোক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
- যন্ত্রপাতি
- ইলেকট্রনিকস
- অটোমোবাইল
- চিকিৎসা সরঞ্জাম
- শিল্প সরঞ্জাম
- সফটওয়্যার
- বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম
- কারিগরি পণ্য
খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিবিদ, ওয়ারেন্টি, স্থাপন অথবা রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে ক্রেতারা অপরিচিত বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে দ্বিধা করতে পারেন।
তাই বিদেশি কোম্পানির উচিত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা:
- ওয়ারেন্টি নীতি
- খুচরা যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা
- কারিগরি সহায়তা
- স্থাপন
- রক্ষণাবেক্ষণ
- অভিযোগ ব্যবস্থাপনা
- প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া
- পরিবেশক প্রশিক্ষণ
শক্তিশালী বিক্রয়োত্তর সেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
ধাপ ১৬: পরিবেশকের জন্য কার্যসম্পাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করুন
কোনো পরিবেশক নিয়োগ করলে পরিমাপযোগ্য প্রত্যাশা নির্ধারণ করুন। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে:
- ন্যূনতম বার্ষিক ক্রয়
- ত্রৈমাসিক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা
- ডিলার নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা
- পণ্যের মজুতসংক্রান্ত শর্ত
- বিপণন ব্যয়
- ভৌগোলিক বাজার কাভারেজ
- প্রতিবেদন প্রদানের বাধ্যবাধকতা
- গ্রাহকসেবার মান
- পণ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ
- ব্র্যান্ড উন্নয়ন কার্যক্রম
একচেটিয়া পরিবেশক অধিকার কোনো শর্ত ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য দেওয়ার পরিবর্তে কার্যসম্পাদনের সঙ্গে যুক্ত করা ভালো।
ধাপ ১৭: কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করুন এবং বাজার সম্প্রসারণ করুন
প্রাথমিক বাজার উদ্বোধনের পর নিয়মিতভাবে কার্যসম্পাদন পর্যবেক্ষণ করুন। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করুন:
বিক্রয়: কোন পণ্য বা এসকেইউ বেশি বিক্রি হচ্ছে?
ভৌগোলিক এলাকা: কোন শহর বা অঞ্চল থেকে বেশি চাহিদা আসছে?
ক্রেতা: কোন ধরনের ক্রেতা সবচেয়ে বেশি বিক্রয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে?
মূল্য: চূড়ান্ত মূল্য কি প্রতিযোগিতামূলক?
বিতরণ: ডিলাররা কি পর্যাপ্ত পণ্য মজুত রাখছে?
বিপণন: কোন প্রচার কার্যক্রম প্রকৃত বিক্রয় তৈরি করছে?
গ্রাহকের মতামত: ক্রেতারা কেন পণ্য কিনছেন অথবা কেন প্রত্যাখ্যান করছেন?
এসব তথ্যের ভিত্তিতে সফল চ্যানেলগুলো সম্প্রসারণ করুন এবং দুর্বল ক্ষেত্রগুলো সংশোধন করুন। বিদেশি ব্র্যান্ডের উচিত বাংলাদেশকে এমন একটি বাজার হিসেবে বিবেচনা করা, যা বিভিন্ন পর্যায়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে। শুরু থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে সারা দেশে সফলতা পাওয়ার প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
বিদেশি কোম্পানিগুলোর যেসব সাধারণ ভুল এড়ানো উচিত
কিছু সাধারণ ভুল বারবার বিদেশি কোম্পানির বাংলাদেশে বাজার প্রবেশের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে। বাজার গবেষণা ছাড়া বাংলাদেশে প্রবেশ করা, খুব দ্রুত একচেটিয়া পরিবেশক অধিকার দেওয়া, শুধু ই-মেইল বা অনলাইন যোগাযোগের ভিত্তিতে আমদানিকারক নির্বাচন করা, নিয়ন্ত্রক শর্ত উপেক্ষা করা, শুধু এফওবি মূল্যের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা হিসাব করা, বাজার পরীক্ষা না করেই অতিরিক্ত পণ্য পাঠানো, স্থানীয়করণ ছাড়া বৈশ্বিক বিপণন উপকরণ ব্যবহার করা, বিক্রয়োত্তর সেবা না দেওয়া এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্যের জন্য সম্পূর্ণভাবে একজন স্থানীয় অংশীদারের ওপর নির্ভর করা এসব ভুল এড়ানো উচিত।
আরেকটি বড় ভুল হলো মনে করা যে একজন আমদানিকারক নিয়োগ করার পর বাজার উন্নয়নের কাজ শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবে আমদানিকারক নিয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই বাজার উন্নয়ন কার্যক্রমের শুরু মাত্র।
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB) কীভাবে বিদেশি পণ্য বাজারজাতকরণে সহায়তা করতে পারে
বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে অপরিচিত বিদেশি কোম্পানিগুলো একজন অভিজ্ঞ স্থানীয় ব্যবসা উন্নয়ন অংশীদারের সহায়তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারে। ট্রেডঅ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB) বিদেশি উৎপাদনকারী, রপ্তানিকারক, বিনিয়োগকারী এবং ব্র্যান্ডকে বাংলাদেশে ব্যবসায়িক সংযোগ তৈরি ও বাজারে অবস্থান গড়ে তুলতে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক সহায়তা প্রদান করে।
T&IB নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিকে সহায়তা করতে পারে:
বাজার গবেষণা ও বাজার প্রবেশ সহায়তা: সম্ভাব্য ক্রেতা, প্রতিযোগী, মূল্য, বাজার কাঠামো এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ সম্পর্কে ধারণা অর্জনে সহায়তা।
আমদানিকারক অনুসন্ধান: নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য উপযুক্ত সম্ভাব্য বাংলাদেশি আমদানিকারক চিহ্নিত করা।
ক্রেতা-বিক্রেতা ম্যাচমেকিং: বিদেশি সরবরাহকারীকে উপযুক্ত আমদানিকারক, ক্রেতা, পরিবেশক এবং প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
ডিলার ও পরিবেশক নিয়োগ: সম্ভাব্য চ্যানেল অংশীদারদের পরিকল্পিতভাবে খুঁজে বের করা এবং প্রাথমিক যাচাইয়ে সহায়তা।
বাণিজ্যিক ডিউ ডিলিজেন্স: গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের আগে সম্ভাব্য অংশীদারের ব্যবসায়িক সক্ষমতা মূল্যায়নে বিদেশি কোম্পানিকে সহায়তা করা।
B2B সভা আয়োজন: প্রাসঙ্গিক কোম্পানি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সভা আয়োজন।
ব্যবসায়িক প্রতিনিধিত্ব: যেসব বিদেশি কোম্পানির বাংলাদেশে নিজস্ব কার্যালয় নেই, তাদের জন্য স্থানীয় সমন্বয় ও যোগাযোগ সহায়তা প্রদান।
ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল ও বাজার পরিদর্শন: বিদেশি কোম্পানির বাংলাদেশ সফর, ব্যবসায়িক সভা, নেটওয়ার্কিং কার্যক্রম এবং বাজার উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা।
একক কোম্পানি প্রদর্শনী: একটি বিদেশি কোম্পানির পণ্য নির্বাচিত বাংলাদেশি ক্রেতা, পরিবেশক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সামনে সরাসরি উপস্থাপনের জন্য বিশেষায়িত পণ্য প্রচার কার্যক্রম আয়োজন।
ডিজিটাল বিপণন ও ব্যবসা প্রচার: বাংলাদেশের বাজারে অনলাইন পরিচিতি, সম্ভাব্য ক্রেতা সংগ্রহ এবং পণ্য প্রচারণায় সহায়তা।
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)-এর সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট দেখুন: https://tradeandinvestmentbangladesh.com
বিদেশি পণ্য বাজারজাতকরণের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ
বাংলাদেশে একটি বিদেশি পণ্য সফলভাবে বাজারজাত করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি নিম্নোক্ত ধারায় সাজানো যেতে পারে: বাজার গবেষণা → এইচএস কোড ও ল্যান্ডেড কস্ট বিশ্লেষণ → নিয়ন্ত্রক শর্ত যাচাই → আমদানিকারক চিহ্নিতকরণ → ডিউ ডিলিজেন্স → পরিবেশক নির্বাচন → পণ্য স্থানীয়করণ → মূল্য নির্ধারণ → পরীক্ষামূলক আমদানি → B2B ম্যাচমেকিং → ডিলার নিয়োগ → বিপণন কার্যক্রম শুরু → বিক্রয়োত্তর সেবা → কার্যসম্পাদন পর্যবেক্ষণ → দেশব্যাপী বাজার সম্প্রসারণ
এই প্রক্রিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এড়িয়ে গেলে শুরুতে সময় সাশ্রয় হতে পারে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ব্যয়বহুল সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশ বিদেশি উৎপাদনকারী এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সফলতার জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি, স্থানীয় বাজারের সঙ্গে অভিযোজন, নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক অংশীদার, নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান অনুসরণ, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, কার্যকর বিতরণ সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক বাজার উন্নয়ন।
তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু এটি নয়: “আমি কীভাবে আমার পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করতে পারি?” এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: “আমি কীভাবে বাংলাদেশে আমার পণ্যের জন্য একটি টেকসই বাজার তৈরি করতে পারি?” এই দুটি প্রশ্নের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
একটি কনটেইনার পণ্য পাঠানো একটি বাণিজ্যিক লেনদেন। কিন্তু আমদানিকারকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, পরিবেশক নেটওয়ার্ক তৈরি, ক্রেতার আস্থা অর্জন, ব্র্যান্ড পরিচিতি সৃষ্টি, পুনরায় ক্রয় নিশ্চিত করা এবং বিক্রয়োত্তর সেবা অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি প্রকৃত বাজার সৃষ্টি হয়।
তাই বাংলাদেশে পণ্য বাজারজাত করার পরিকল্পনাকারী বিদেশি উৎপাদনকারীদের উচিত পেশাদার বাজার মূল্যায়নের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা, উপযুক্ত স্থানীয় অংশীদার চিহ্নিত ও যাচাই করা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং ল্যান্ডেড কস্ট সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া, সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে বাজারে প্রবেশ করা এবং এরপর পরিকল্পিতভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা।
একটি সুপরিকল্পিত বাজার প্রবেশ কৌশল এবং দক্ষ স্থানীয় ব্যবসায়িক সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি বাজারে পরিণত হতে পারে।
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB) বিদেশি কোম্পানিকে এই পুরো যাত্রায় সহায়তা করতে পারে—প্রাথমিক বাজার গবেষণা এবং আমদানিকারক চিহ্নিতকরণ থেকে শুরু করে ক্রেতা-বিক্রেতা ম্যাচমেকিং, পরিবেশক নিয়োগ, ডিউ ডিলিজেন্স, পণ্য প্রচার, B2B সভা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা উন্নয়ন পর্যন্ত। ওয়েবসাইট: https://tradeandinvestmentbangladesh.com



Comments